চা পানের উপকারিতা এবং অসুবিধা

চা সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। এর প্রেমিকরা একে বিভিন্ন ভাবে খেতে পছন্দ করে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, চা পানের উপকারিতা জানার জন্য এটি নিয়ে অনেক ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা হয়েছে, যার কারণে এর জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। আপনি জেনে অবাক হবেন যে, নিয়মিত চা পান অনেক ধরনের শারীরিক সমস্যার প্রভাব এবং লক্ষণগুলি কমাতে সাহায্য করতে পারে।এই কথা মাথায় রেখেই আমরা আজকের এই আর্টিকেলে চা পানের উপকারিতা সম্পর্কে আপনাদের সাথে আলোচনা করব। এর পাশাপাশি আমরা এখানে চায়ের ব্যবহার এবং চা পানের কিন্তু অপকারিতা সম্পর্কেও আলোচনা করব।

চা পানের উপকারিতা – চায়ের উপকারিতা

চা পানকারীদের জন্য এটি কোনো এনার্জি ড্রিংক থেকে কোন অংশেই কম নয়। চা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পানীয় হিসাবে বিবেচিত হয়। সেই সাথে শীতের সময় চা কোনো ওষুধের চেয়ে কম নয়। চায়ের বৈজ্ঞানিক হল নাম ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস। এতে অনেক ধরনের ঔষধি উপাদান রয়েছে, যা ক্যান্সার, হৃদরোগ, বাত এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে খুব ভাল কাজ করে। তাহলে চলুন চা পানের উপকারিতাগুলো পর্যায়ক্রমে জেনে নেই। তার আগে এটা বোঝা জরুরি যে অতিরিক্ত চা খাওয়ার কারণে ক্যাফেইনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সেই সঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, চা কে কোনো সমস্যার সম্পূর্ণ নিরাময় বা প্রতিকার বলা যাবে না। যেকোনো সমস্যার সম্পূর্ণ নিরাময় নির্ভর করে চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর।

ক্যান্সার প্রতিরোধে চায়ের উপকারিতা

চা ক্যান্সার প্রতিরোধে কিছুটা হলেও কার্যকরী ভুমিকা পালন করে। আসলে, চায়ে পলিফেনল নামক উপাদান রয়েছে, যা টিউমার কোষের ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে পারে। NCBI (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে যে, গ্রিন টি ডিটক্সিফিকেশন এনজাইমগুলিকে সক্রিয় করতে কাজ করে যেমন গ্লুটাথিয়ন এস-ট্রান্সফারেজ এবং কুইনোন রিডাক্টেস, যা টিউমার বৃদ্ধি বন্ধ করতে কাজ করতে পারে। এছাড়াও, গ্রিন টি এবং ব্ল্যাক টি-তে উপস্থিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্ল্যাভোনয়েডস (এপিগালোকাটেচিন,এপিকেটেচিন, এপিকাটেচিন গ্যালেট) কেমোপ্রিভেন্টিভ (ক্যান্সার প্রতিরোধক) প্রভাব দেখাতে পারে ( তথ্যসূত্র )। তবে অবশ্যই মনে রাখবেন যে, ক্যান্সার একটি মারাত্মক রোগ। এর চিকিৎসার জন্য শুধুমাত্র ঘরোয়া প্রতিকারের উপর নির্ভর করা উচিত নয়। ঘরোয়া প্রতিকারের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে সঠিক চিকিৎসা নিন।

চা হার্টের জন্য উপকারী

সুষম পরিমাণে গ্রিন টি বা ব্ল্যাক টি নিয়মিত পান করলে হার্ট সুস্থ থাকে। প্রকৃতপক্ষে, যারা নিয়মিত চা পান করেন তাদের রক্তচাপ, সিরামে লিপিডের পরিমাণ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে থাকে। এছাড়া কোলেস্টেরলও কমে, যার কারণে শরীরে হৃদরোগের প্রবণতা কমে যায় । তবে, হার্টের স্বাস্থ্যের উপর চা এর ভাল প্রভাবগুলি জানতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে ( তথ্যসূত্র )।

বাত রোগে চা পানের উপকারিতা

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ফোলাভাব এর মত সমস্যা দেখা যায়। এই ধরনের সমস্যায় আরাম দিতে পারে গ্রিন টি। NCBI-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, সবুজ চা এবং কালো চায়ে প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমাতে খুব ভাল কাজ করে ( তথ্যসূত্র )। 

ডায়াবেটিস কমাতে চায়ের উপকারিতা

NCBI-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়ের উপকারিতা সম্পর্কে বলা হয়েছে।গবেষণায় আরও বলা হয়েছে যে, চা ডায়াবেটিস এবং এর সাথে সম্পর্কিত জটিলতার ঝুঁকি কমাতে খুব ভাল কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, চা ইনসুলিনের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করে, যা রক্তে শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে পারে। এর ভিত্তিতে বলা যায়, নিয়মিত চা পান করা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের চা যেমন সবুজ চা, কালো চা এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ( তথ্যসূত্র )।

আরও পড়ুনঃ প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া কমানোর ঘরোয়া উপায়

মাথাব্যথার জন্য চায়ের উপকারিতা

মাথাব্যথার ক্ষেত্রেও চা পানের উপকারিতা দেখা যায়। আসলে এতে ক্যাফেইন পাওয়া যায়, যা মাথাব্যথার প্রভাব কিছুটা কমাতে সাহায্য করে। একটি সমীক্ষা অনুসারে, ২৩৭ মিলি কালো চায়ে প্রায় ৩০ থেকে ৮০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকে। একই সময়ে, ২৩৭ মিলি গ্রিন টি তে ৩৫ থেকে ৬০ মিলি ক্যাফিন পাওয়া যায় । একজন সুস্থ ব্যক্তি প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করতে পারেন, এর চেয়ে বেশি ক্যাফিন গ্রহণ করলে মাথাব্যথা, অনিদ্রা এবং অস্থিরতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে ( তথ্যসূত্র )।

অ্যান্টি-এজিং বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ

বার্ধক্যের প্রভাব অনেকাংশে কমাতেও চা উপকারী। NCBI-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে পলিফেনল (কেটচিন) নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সবুজ চায়ে পাওয়া যায়, যা আমাদের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। আবার কালো চায়ে থেফ্লাভিন নামক উপাদান থাকে। এই উপাদানগুলো বলিরেখা প্রতিরোধ করে ত্বকের সুরক্ষা দিতে সক্ষম । এমন পরিস্থিতিতে, চা পান করার পাশাপাশি, এটি সরাসরি ত্বকেও প্রয়োগ করা যেতে পারে ( তথ্যসূত্র )।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট

চায়ে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরে ফ্রি র‍্যাডিক্যালের প্রভাব কমাতে খুব ভাল কাজ করে। এই ফ্রি র‍্যাডিক্যাল কমে যাওয়ার কারণে হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং বার্ধক্যজনিত সমস্যার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। অতএব, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খাবারের অন্তর্ভুক্ত চা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী বলে মনে করা হয় ( তথ্যসূত্র )।

প্রদাহ কমাতে পারে

প্রদাহজনিত সমস্যায় চা খুব ভাল কাজ করে। প্রকৃতপক্ষে, চায়ের প্রদাহ-বিরোধী বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা বিভিন্ন ধরনের প্রদাহকে উপশম করতে পারে। হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো প্রদাহজনিত সমস্যায় চা পান করলে ভাল উপকার পাওয়া যায় ।

চায়ের পুষ্টি উপাদান – চায়ের পুষ্টির মান

ইতিমধ্যেই আপনারা পুষ্টিগুণে ভরপুর চায়ের অনেক ধরনের উপকারিতা সম্পর্কে জেনে গেছেন। নীচে আমরা কালো বা লাল চায়ে পাওয়া সমস্ত পুষ্টির কথা বলছি ( তথ্যসূত্র )।

পুষ্টি উপাদান প্রতি 100 গ্রাম পরিমাণ
জল 99.7 গ্রাম
শক্তি 1 কিলোক্যালরি
কার্বোহাইড্রেট 0.3 গ্রাম
আয়রন 0.02 মিলিগ্রাম
ম্যাগনেসিয়াম 3 মি.গ্রা
দস্তা 0.02 মিলিগ্রাম
তামা 0.01 মিলিগ্রাম
রিবোফ্লাভিন 0.014 মিলিগ্রাম
ফোলেট মোট 5 µg
ফোলেট খাবার 5 µg
ফোলেট ডিএফই 5 µg
কোলিন 0.4 মিলিগ্রাম
ফ্যাটি অ্যাসিড মোট স্যাচুরেটেড 0.002 গ্রাম
ফ্যাটি অ্যাসিড মোট মনোস্যাচুরেটেড 0.001 গ্রাম
ফ্যাটি অ্যাসিড মোট পলিআনস্যাচুরেটেড 0.004 গ্রাম
ক্যাফিন 20 মিলিগ্রাম
থিওব্রোমাইন 2 মি.গ্রা

চায়ের ব্যবহার – চা কীভাবে ব্যবহার করবেন

চা সাধারনত পানীয় হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। চা পান করার সুবিধাগুলি নেওয়ার জন্য, এটি ব্যবহার করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে।

  • পানিতে চা পাতা সিদ্ধ করে অনেক রকমের চা তৈরি করা যায়। এই চায়ে স্বাদ অনুযায়ী লেবু, এলাচ ও আদা মেশাতে পারেন। বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ আদা এবং লেবু চা পছন্দ করে।
  • গ্রিন টি চুলকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ( এর জন্য গ্রিন টি দিয়ে আপনি আপনার চুল ধুয়ে নিতে পারেন।)
  • ক্যাফেইন উপস্থিত থাকার কারণে, চা পাতা ডার্ক সার্কেল দূর করার জন্য একটি ঘরোয়া প্রতিকার হিসাবেও ব্যবহার করা যেতে পারে ( তথ্যসূত্র )। এটি করার জন্য ব্যবহৃত টি ব্যাগটি চোখের ওপর কয়েক মিনিটের জন্য রেখে দিতে পারেন।
  • ভেষজ চায়ে আইস কিউব ব্যবহার করে আইস টি উপভোগ করা যায়।
  • আপনারা দুধ চা বানিয়েও পান করতে পারেন। এ জন্য দুধ, চা পাতা ও চিনি একসাথে ফুটিয়ে নিয়ে পান করা যেতে পারে।
  • সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি পেতে আদা, তুলসি ও এলাচ চা এর সাথে মিশিয়ে পান করতে পারেন।
  • কালো মরিচ এবং দারুচিনি মিশিয়ে চা তৈরি করে একটি ক্বাথ হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

কতটা পান করবেন: NCBI ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে দিনে ২ থেকে ৩ কাপ চা পান করতে পাতেন ( তথ্যসূত্র )। যেহেতু চা পান করার সুবিধার পাশাপাশি এর অনেক ধরনের অসুবিধাও রয়েছে তাই অতিরিক্ত চা পান করা সবসময় এড়িয়ে চলতে হবে।

অত্যধিক চা পানের অসুবিধা – চায়ের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

নিয়মিত চা পান করা ভাল, তবে অতিরিক্ত চা পান করার ফলে নিম্নলিখিত সমস্যা হতে পারে।

  • চা আয়রনের শোষণ কমায় : চায়ে ট্যানিন নামক একটি উপাদান পাওয়া যায়। এই উপাদানটি শরীরের আয়রন শোষণ করার ক্ষমতা কমাতে পারে । এ কারণেই খাবার খাওয়ার পরপরই কখনই চা পান করবেন না।
  •  চা উদ্বেগ ও মানসিক চাপের কারণ হতে পারে: চা তে ক্যাফেইন থাকে এবং অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহন করলে স্নায়বিক রোগ হতে পারে। অত্যধিক পরিমাণে চা পান করলে উদ্বেগ, চাপ এবং অস্থিরতা বাড়াতে পারে ( তথ্য )।
  • চা অনিদ্রা ও হৃদরোগের কারণ হতে পারে: যদিও আর্টিকেলে বলা হয়েছে যে, চা হৃদরোগে কিছুটা হলেও সহায়ক।তারপরেও, চায়ে উপস্থিত ক্যাফিনের কারণে অত্যধিক চা পান করলে হৃদরোগ এবং অনিদ্রার মত সমস্যা হতে পারে ।
  • চা বমি বমি ভাব সৃষ্টি করতে পারে: সবুজ এবং কালো চায়ে ক্যাফেইন থাকে, যার কারণে চা বেশি পরিমাণে পান করলে বমি বমি ভাব হতে পারে।
  • চা থেকে অম্বল হতে পারে : চায়ে ক্যাফেইন থাকে, যা আমরা এই আর্টিকেলে আগেই উল্লেখ করেছি। এছাড়াও, এটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্যাফিন পেটে গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিডের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে, যা অম্বল হতে পারে । তাই অ্যাসিডিটিতে আক্রান্ত রোগীর চা কম পরিমাণে খাওয়া উচিত ।
  • গর্ভাবস্থায় চা খাওয়া : গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত চা পান করলে গর্ভপাত পর্যন্ত হতে পারে।

শেষ কথা

আশা করি আর্টিকেলে উল্লেখিত চা পানের উপকারিতাগুলো সম্পর্কে আপনারা বুঝতে পেরেছেন। এর সুবিধা পেতে, আপনি আর্টিকেলে উল্লিখিত পদ্ধতিগুলি গ্রহণ করতে পারেন। চা পান করার সময় অবশ্যই মনে রাখবেন যে, এতে ক্যাফেইন রয়েছে, যা আর্টিকেলে উল্লিখিত চায়ের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও কোন ধরনের চা আপনার শরীরের জন্য বেশি উপকারী হবে, এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। 

আর্টিকেলটি নিয়ে যে কোন ধরনের প্রশ্ন বা মন্তব্য থাকলে কমেন্ট সেকশনে জানান

ধন্যবাদ ।

 

Share on:

আমি অঞ্জন, এই সাইটটির প্রতিষ্ঠাতা। এই ব্লগে টিপস & ট্রিকস, অনলাইন ইনকাম, কম্পিউটার সমস্যা সমাধান সহ আরো অনেক কিছুর উপর সঠিক ও নির্ভুল তথ্য দেওয়া হয়।

Leave a Comment