থাইরয়েড কী? থাইরয়েড রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

বর্তমানে সারা বিশ্বে থাইরয়েড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা একটি উদ্বেগের বিষয়। তাই আজকের আর্টিকেলে আমরা থাইরয়েড সম্পর্কে তথ্য দিতে যাচ্ছি, যাতে আপনারা এটি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিতে পারেন। এই আর্টিকেলে আমরা আপনাদেরকে থাইরয়েড কী, থাইরয়েড কেন হয়, থাইরয়েডের লক্ষণ এবং থাইরয়েডের প্রকারগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করব। এছাড়াও, এখানে আপনি থাইরয়েডের ঘরোয়া প্রতিকার সম্পর্কেও জানতে পারবেন। তবে এই ঘরোয়া প্রতিকারগুলি সম্পূর্ণরূপে থাইরয়েড রোগ নিরাময় করতে পারে না। এই প্রতিকারগুলো এর লক্ষণ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। এর পাশাপাশি এটি থাইরয়েডের ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে।থাইরয়েড এমন একটি সমস্যা যেখানে চিকিৎসা নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, থাইরয়েডের ওষুধ সম্পর্কিত কিছু টিপসও এই আর্টিকেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তাহলে চলুন প্রথমেই জেনে নেয়া যাক থাইরয়েড কি? পরে আমরা এই সমস্যা সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

থাইরয়েড কি – Thyroid কি

থাইরয়েড কোনো রোগ নয়, এটি আমাদের ঘাড়ের সামনের অংশে পাওয়া একটি গ্রন্থি। এটি দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো আকৃতির। এই থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তর করতে কাজ করে থাকে। থাইরয়েড গ্রন্থি T3 অর্থাৎ ট্রাইডোথাইরোনাইন এবং T4 অর্থাৎ থাইরক্সিন হরমোন তৈরি করে। এই হরমোনগুলি শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, পরিপাকতন্ত্র এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি কাজ করে। সেই সাথে, এটি হাড়, পেশী এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এই হরমোনগুলি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে অর্থাৎ যখন এর ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস হয় তখন একে থাইরয়েড সমস্যা বলে ( তথ্যসুত্র )।

এছাড়া আমাদের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে আরেক ধরণের হরমোন নিঃসৃত হয়, যাকে বলে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH)। এই টিএসএইচ হরমোন শরীরের অন্য দুটি থাইরয়েড হরমোন, T3 এবং T4 এর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি শরীরের ওজন, তাপমাত্রা, পেশী শক্তি এবং এমনকি মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।

পুরুষদের তুলনায় মহিলা এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের থাইরয়েড হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে । এছাড়াও, যদি আপনার পরিবারের কারও আগে থেকে এই সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে ( তথ্যসূত্র )।

থাইরয়েড কত প্রকার

থাইরয়েড প্রধানত ছয় প্রকার, যা নিম্নরূপ-

  • হাইপোথাইরয়েডিজম (Hypothyroidism)- যখন থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন তৈরি করে।
  • হাইপারথাইরয়েডিজম – যখন থাইরয়েড গ্রন্থি অনেক বেশি পরিমাণে হরমোন তৈরি করে।
  • Goiter – খাবারে আয়োডিনের ঘাটতি হলে এটি হয়, যার ফলে গলায় ফোলাভাব এবং পিণ্ডের মতো আকার দেখা দেয়।
  • থাইরয়েডাইটিস- এতে থাইরয়েড গ্রন্থির প্রদাহ বা জ্বালা হয়।
  • থাইরয়েড নোডুলস – এতে , থাইরয়েড গ্রন্থিতে একটি পিণ্ডের মত তৈরি হতে শুরু করে।
  • থাইরয়েড ক্যান্সার

থাইরয়েড রোগের লক্ষণ কি কি

আপনার শরীরে যদি নিচের উপসর্গ গুলো দেখতে পান, তাহলে এগুলো থাইরয়েডের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। মনে রাখবেন যে, থাইরয়েডের লক্ষণগুলি খুব সাধারণ রোগের মতো দেখা দিতে পারে, তাই শরীরের যে কোনও পরিবর্তনকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় মহিলাদের মধ্যে থাইরয়েডের লক্ষণ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত ( তথ্যসূত্র )।

  • কোষ্ঠকাঠিন্য
  • ক্লান্তি
  • ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
  • ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস
  • ঘাম কমে যাওয়া
  • হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • জয়েন্টে ফোলা বা ব্যথা
  • পাতলা এবং ভঙ্গুর চুল
  • স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক মাসিক
  • পেশী ব্যথা
  • মুখের উপর ফোলা ভাব
  • কম বয়সে চুল পেকে যাওয়া

থাইরয়েড কি কারনে হয়

থাইরয়েড রোগ অনেক কারণে হতে পারে। থাইরয়েড হওয়ার কিছু কারণ নিচে উল্লেখ করা হল –

  • আপনার যদি আগে কখনো থাইরয়েড হয়ে থাকে।
  • আয়োডিনের অভাবে
  • 30 বছরের বেশি বয়স হওয়ার পরে
  • টাইপ 1 ডায়াবেটিস বা অন্যান্য অটোইমিউন রোগের কারণে
  • গর্ভপাত, অকাল জন্ম বা বন্ধ্যাত্বের কারণে
  • অটোইমিউন থাইরয়েড রোগ বা থাইরয়েড রোগে যদি পারিবারের কারো থেকে থাকে
  • টাইপ 2 ডায়াবেটিসের কারণে
  • নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে
  • খারাপ খাদ্যাভ্যাস, যেমন অতিরিক্ত ভাজা খাবার গ্রহন করার কারণে
  • জাঙ্ক ফুড এবং পরিশোধিত ময়দা থেকে তৈরি খাবার প্রচুর পরিমাণে গ্রহন করলে
  • ওজন বা স্থূলতা বৃদ্ধির কারণে
আরও পড়ুনঃ সাইনোসাইটিস কি? সাইনোসাইটিসের কারণ, লক্ষণ, ঘরোয়া প্রতিকার

থাইরয়েড রোগের ঘরোয়া প্রতিকার

আর্টিকেলের এই পর্যায়ে আমরা থাইরয়েড রোগের কিছু ঘরোয়া প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে যাচ্ছি। যা এই সমস্যা থেকে অনেকাংশে মুক্তি দিতে সাহায্য করে। তবে একটি বিষয় মনে রাখবেন যে, এই ঘরোয়া প্রতিকারগুলির সবার জন্য সমান ভাবে কাজ নাও করতে পারে, কারণ ভিন্ন ভিন্ন মানুষের শারীরিক ক্ষমতা এবং থাইরয়েডের অবস্থা ভিন্ন। এমন পরিস্থিতিতে, কিছু প্রতিকার একজনের ক্ষেত্রে ভাল কাজ করবে আবার অন্য জনের ক্ষেত্রে কম কাজ করবে। অতএব, চিকিৎসার পাশাপাশি, এই ঘরোয়া প্রতিকারগুলি ব্যবহার করার আগে আপনারা অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিন।

অশ্বগন্ধা

জিনিসপত্র :

  • অশ্বগন্ধা ক্যাপসুল (500mg)

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • চিকিৎসকের পরামর্শে অশ্বগন্ধা ক্যাপসুল প্রতিদিন খেতে পারেন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • প্রতিদিন এক বা দুটি ক্যাপসুল খাওয়া যেতে পারে।

কীভাবে উপকারী:

অশ্বগন্ধা দিয়ে থাইরয়েডের চিকিৎসা করা যায় । অশ্বগন্ধা একটি স্ট্রেস-হ্রাসকারী ভেষজ হিসাবে পরিচিত। অ্যাডাপ্টোজেন শরীরকে চাপের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে। প্রাণীদের উপর এনসিবিআই (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) এর গবেষণায় এটি স্পষ্টভাবে প্রমানিত হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে অশ্বগন্ধা থাইরয়েড হরমোন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে ( তথ্যসূত্র )। তবে এটি লক্ষ রাখতে হবে যে, থাইরয়েড এড়ানোর উপায় হিসাবে এটির ব্যবহার ব্যক্তির থাইরয়েডের অবস্থার উপরও নির্ভর করে। তাই থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায় এটি ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

Essential Oils

থাইরয়েডের উপসর্গের ক্ষেত্রে Essential Oil এর ব্যবহার সহায়ক হতে পারে। অ্যারোমাথেরাপির সাথে সম্পর্কিত Essential Oil এর উপর গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই তেল হাইপোথাইরয়েড (কম থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন) দ্বারা সৃষ্ট ক্লান্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে। এর ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে Essential Oils এর সাহায্যে আক্রান্ত থাইরয়েড গ্রন্থিকে হালকাভাবে ম্যাসাজ করলে এবং এটির গন্ধ নিলে উপকার পাওয়া যায় ( তথ্যসূত্র )। থাইরয়েড সংক্রান্ত আরেকটি গবেষণায় থাইরয়েড এড়াতে কিছু প্রাকৃতিক ভেষজকে উপকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে লেমন বাম, রোজ মেরি ইত্যাদি।

Minerals

মিনারেলের ঘাটতি, গলায় থাইরয়েড উপসর্গের অন্যতম কারণ হতে পারে। সেই সঙ্গে এটাও ভালো করে জেনে নিতে হবে যে পুষ্টির অভাবে অনেক ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েডও এমন একটি সমস্যা, যা আয়োডিনের মত খনিজের অভাবে হতে পারে। এর পাশাপাশি আয়রন, সেলেনিয়াম, ভিটামিন-এ, থায়োসায়ানেট এবং আইসোফ্লাভিন-এর মতো কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবের কারণেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। ইতালির বারি ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটিও বিশ্বাস করা হয় যে খাদ্যে আয়োডিনযুক্ত লবণ বা তেল যোগ করা এমন অবস্থায় ভাল কাজ করে। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে, এটি অনুমান করা যেতে পারে যে খাদ্যে এই সমস্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার যোগ করা থাইরয়েডের লক্ষণগুলি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

Kelp সাপ্লিমেন্ট

জিনিসপত্র :

  • কেল্প সাপ্লিমেন্ট, যাতে 150-175 মাইক্রোগ্রাম আয়োডিন থাকে।

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • কেল্পের এই পরিপূরকটি ডাক্তারের পরামর্শে খাওয়া যেতে পারে।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এটি কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে প্রতিদিন একবার খাওয়া যেতে পারে।

কীভাবে উপকারী:

গলায় থাইরয়েডের লক্ষণ দেখা গেলে কেল্প সাপ্লিমেন্ট দিয়েও থাইরয়েডের চিকিৎসা করা যেতে পারে। এটি এক ধরনের সামুদ্রিক আগাছা, যা সমুদ্রের গভীরে পাওয়া যায়। এটি আয়োডিনের একটি প্রধান উৎস হিসাবে বিবেচিত হয় ( তথ্যসূত্র )। যদি কারো আয়োডিনের অভাবজনিত থাইরয়েডের সমস্যা থাকে, তবে কেল্প এটিতে অত্তন্ত্য কার্যকরী । এই ভিত্তিতে, এটি থাইরয়েডের জন্য একটি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। 

ভিটামিন

ভিটামিনের সাহায্যে ঘরে বসেই থাইরয়েডের চিকিৎসা করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, থাইরয়েড সমস্যায় ভিটামিনের ভূমিকা নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায়, এটি প্রমানিত হয়েছে যে, কিছু ভিটামিন এই সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে।গবেষণায় উল্লিখিত ভিটামিনগুলির মধ্যে প্রধানত ভিটামিন ডি এর সাথে ভিটামিন এ, সি, ই, বি-6, বি-12 ( তথ্যসূত্র ) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ভিত্তিতে ধারণা করা যায় যে, এই ধরনের ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার বা সাপ্লিমেন্টের সাহায্যে থাইরয়েডের সমস্যা সহ থাইরয়েডের উপসর্গ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মনে রাখবেন, ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে অবশ্যই একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

Flax seed

জিনিসপত্র :

  • এক চা চামচ ফ্ল্যাক্স সিড পাউডার
  • এক গ্লাস ফলের রস

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • পানি বা ফলের রসে ফ্ল্যাক্সসিড পাউডার যোগ করুন।
  • এবার ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে পান করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এই মিশ্রণটি দিনে এক থেকে দুইবার পান করা যেতে পারে।

কীভাবে উপকারী:

থাইরয়েড গ্রন্থির সঠিক কার্যকারিতায় ফ্ল্যাক্সসিড ভাল কাজ করে। তাই এটিকে থাইরয়েডের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, এতে ওমেগা 3 ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা হাইপোথাইরয়েডিজমের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে থাকে ( তথ্যসূত্র )। এমন পরিস্থিতিতে হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিসির বীজ খেতে পারেন। যাইহোক, অন্য একটি চিকিৎসা গবেষণা অনুসারে, ফ্ল্যাক্সসিডের অত্যধিক বা দীর্ঘায়িত ব্যবহারও গলগন্ড বা আয়োডিনের অভাবজনিত সমস্যার কারণ হতে পারে ( তথ্যসূত্র )। তাই ফ্ল্যাক্সসিড দিয়ে থাইরয়েডের ঘরোয়া চিকিৎসা নেওয়ার আগে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

নারকেল তেল

জিনিসপত্র :

  • এক থেকে দুই টেবিল চামচ বিশুদ্ধ নারকেল তেল
  • এক গ্লাস গরম পানি

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • আপনি প্রতিদিন এক গ্লাস পানিতে বিশুদ্ধ নারকেল তেল মিশিয়ে খেতে পারেন।
  • আপনি যদি এটি পছন্দ না করেন তবে রান্নার সময় নারকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন।

কীভাবে উপকারী:

থাইরয়েড রোগের চিকিৎসার জন্য নারকেল তেল একটি ভাল প্রতিকার হতে পারে। এটি থাইরয়েডের উপসর্গ কমিয়ে থাইরয়েড গ্রন্থিকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে ( তথ্যসূত্র )। যদি কোনো রোগী থাইরয়েডের ওষুধ সেবন করে থাকেন, তাহলে ভার্জিন নারকেল তেল ব্যবহার করে থাইরয়েডের ঘরোয়া চিকিৎসা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আদা

জিনিসপত্র :

  • একটি মাঝারি আকারের আদা টুকরা
  • এক কাপ পানি
  • এক চা চামচ মধু (স্বাদমতো)

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • প্রথমে আদা টুকরো করে কেটে নিন।
  • এরপর পানি গরম করে তাতে আদার টুকরোগুলো দিয়ে দিন।
  • এবার পানি সামান্য গরম হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তারপর এতে মধু মিশিয়ে চায়ের মতো পান করুন।
  • এছাড়া রান্নায়ও আদা ব্যবহার করা যায়।
  • আদা চিবিয়েও খেতে পারেন

নিম্নরূপ উপকারী:

থাইরয়েডের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা আদার সাহায্যে করা সম্ভব। আসলে, আদার মধ্যে জিঙ্ক, পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম রয়েছে। এটিতে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্যও রয়েছে, যা এটিকে থাইরয়েডের জন্য একটি ভাল ঘরোয়া প্রতিকার করে তোলে।থাইরয়েডের চিকিৎসার জন্য আদা বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা যেতে পারে ( তথ্যসূত্র )। তবে থাইরয়েড রোগের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের নির্দেশিত ওষুধের সাথে সাথে খেতে হবে।

কালো গোল মরিচ

জিনিসপত্র :

  • ৫ থেকে ৬টি কালো গোলমরিচ
  • এক কাপ হালকা গরম পানি

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • প্রথমে কালো গোল মরিচের বীজ গুঁড়ো করে পিষে নিন।
  • এবার এক কাপ কুসুম গরম পানিতে কালো মরিচ গুড়ো মিশিয়ে পান করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এই প্রক্রিয়াটি প্রতিদিন একবার ব্যবহার করা যেতে পারে।

কীভাবে উপকারী:

থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায় কালো গোল মরিচ ব্যবহার করা যায়। দেবী অহিল্যা ইনস্টিটিউট দ্বারা পরিচালিত একটি গবেষণা নিশ্চিত করে যে কালো গোল মরিচ খাওয়া থাইরয়েড সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। ইঁদুরের ওপর ভিত্তি করে করা এই গবেষণায় বলা হয়েছে, কালো মরিচে পিপারিন নামে একটি বিশেষ উপাদান পাওয়া যায়। এই উপাদান থাইরয়েড হরমোন নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। একই সময়ে, উচ্চ পরিমাণে পিপারিন থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকলাপকেও কমাতে পারে ( তথ্যসূত্র )। এই ভিত্তিতে, এটি বিশ্বাস করা যেতে পারে যে গোল মরিচ থাইরয়েডের উপসর্গগুলি দূর করতে এবং বাড়িতে থাইরয়েড রোগের চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে। যদি এটি সুষম পরিমাণে খাওয়া হয়।

ধনে পাতা

জিনিসপত্র :

  • প্রয়োজন মত ধনে পাতা
  • এক গ্লাস হালকা গরম পানি

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • প্রথমে ধনে পাতা কুচি করে পেস্ট তৈরি করে নিন।
  • এবার এই পেস্টটি এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে পান করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এই প্রক্রিয়াটি প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কীভাবে উপকারী:

ধনে সম্পর্কিত একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে ধনে গাছ এবং বীজের নির্যাসগুলিতে অ্যান্টি-থাইরয়েড (থাইরয়েড হরমোন হ্রাস) বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ধনেতে উপস্থিত ফ্ল্যাভোনয়েড হাইপারথাইরয়েডের সমস্যায় উপকারী বলে বিবেচিত হতে পারে।তবে গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ধনে পাতায় ফ্ল্যাভোনয়েডের পরিমাণ বীজের তুলনায় অনেক বেশি। তাই ধনে পাতার অত্যধিক ব্যবহার সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।  এমন পরিস্থিতিতে, এই ঘরোয়া প্রতিকারটি শুষ্ক থাইরয়েডের লক্ষণগুলি থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করতে পারে।

করলা রস

জিনিসপত্র :

  • করলা ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিন
  • 4 বা 5 টি পুদিনা পাতা
  • এক চিমটি কালো গোল মরিচের গুঁড়া
  • এক চিমটি লবণ (স্বাদমতো)
  • লেবুর রস 3 বা 4 ফোঁটা
  • এক গ্লাস পানি

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • প্রথমে মিক্সারে পানি, করলার টুকরো ও পুদিনা পাতা দিয়ে ভালো করে পিষে নিন।
  • এবার তৈরি জুসটি ছাকনির সাহায্যে ছেঁকে গ্লাসে তুলে নিন।
  • এবার লেবু, লবণ ও গোলমরিচ মিশিয়ে পান করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এই রস প্রতিদিন সকালে খালি পেটে পান করতে পারেন।

কীভাবে উপকারী:

দুটি ভিন্ন গবেষণা থেকে এটা পরিষ্কার যে থাইরয়েডের বড় হওয়া কমাতে করলা এবং লাউয়ের খোসা ব্যবহার সহায়ক হতে পারে।করলা সম্পর্কিত একটি NCBI গবেষণা উল্লেখ করেছে যে করলায় উপস্থিত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রভাবের কারণে এটি অ্যান্টিথাইরয়েড (থাইরয়েড হরমোন হ্রাস) বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করতে পারে ( তথ্যসূত্র )। 

দই

জিনিসপত্র :

  • এক কাপ দই
  • এক চিমটি লবণ (স্বাদে)

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • এক কাপ দইয়ে এক চিমটি লবণ মিশিয়ে খাবারে ব্যবহার করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এটি খাবারের সাথে বা এক দিনে প্রায় দুবার খাওয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

কীভাবে উপকারী:

আয়োডিন-সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে দইও রয়েছে, যা শরীরে আয়োডিন পূরণ করে আয়োডিনের অভাবজনিত থাইরয়েড সমস্যায় সহায়ক হতে পারে ( তথ্যসূত্র )। উপরন্তু, এটি থাইরয়েড রোগের উপসর্গ উপশম করতে সাহায্য করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আয়োডিনের ঘাটতি পূরণে এটিকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে ।

আপেল সিডার ভিনেগার

জিনিসপত্র :

  • এক গ্লাস পানি
  • এক থেকে দুই টেবিল চামচ আপেল সিডার ভিনেগার

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • পানির সঙ্গে আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে পান করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এটি সকালে এবং সন্ধ্যায় খাবারের প্রায় এক ঘন্টা আগে পান করুন।

নিম্নরূপ উপকারী:

আপেল সিডার ভিনেগারকে থাইরয়েডের জন্য একটি প্যানেসিয়া বলা যেতে পারে। NCBI-এর একটি গবেষণা অনুসারে, আপেল সিডার ভিনেগার বর্ধিত লিপিড এবং রক্তে শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করে স্থূলতার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে ( ্তথ্যসূত্র )। আরটিকেলের শুরুতেই বলা হয়েছে যে, স্থূলতা থাইরয়েডের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। এর ভিত্তিতে, এটি অনুমান করা যেতে পারে যে শরীরের প্রতিবন্ধী বিপাকীয় প্রক্রিয়া সংশোধন করে, এটি থাইরয়েডের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সহায়ক প্রমাণিত হতে পারে।এর পাশাপাশি, এটি থাইরয়েড রোগের লক্ষণগুলি কমাতেও সহায়ক হতে পারে। 

আমলা

জিনিসপত্র :

  • এক চামচ আমলা গুঁড়া
  • এক গ্লাস হালকা গরম পানি

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে আমলা গুঁড়ো মিশিয়ে পান করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এই প্রক্রিয়াটি দিনে এক থেকে দুইবার পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে।

নিম্নরূপ উপকারী:

হাইপারথাইরয়েডিজমের ঘরোয়া প্রতিকার হিসেবেও আমলা ব্যবহার করা যেতে পারে। এটিকে হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য একটি প্যানেসিয়াও বলা যেতে পারে। দেবী অহিল্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা নিশ্চিত করে যে, আমলা সেবন বর্ধিত থাইরয়েড কমাতে সহায়ক হতে পারে। গবেষণায় বলা হয়েছে যে, আমলায় উপস্থিত হেপাটোপ্রোটেকটিভ (লিভার-সুরক্ষা) বৈশিষ্ট্যগুলি এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে ( তথ্যসূত্র )। এই ভিত্তিতে, এটা বিশ্বাস করা যেতে পারে যে হাইপারথাইরয়েডিজমের উপসর্গগুলি কমিয়ে থাইরয়েডের চিকিৎসায় আমলকী সহায়ক হতে পারে।

অ্যালোভেরা

জিনিসপত্র :

  • এক চামচ অ্যালোভেরার রস
  • এক গ্লাস হালকা গরম পানি

ব্যবহারের পদ্ধতি:

  • এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে অ্যালোভেরার রস মিশিয়ে পান করুন।

কতবার ব্যবহার করতে হবে?

  • এটি প্রতিদিন একবার পান করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

কীভাবে উপকারী:

অ্যালোভেরাকে থাইরয়েডের জন্য একটি ওষুধ হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অ্যালোভেরার ওপর প্রকাশিত একটি গবেষণা জার্নালে অ্যালোভেরার রসকে হাইপোথাইরয়েড (থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন না হওয়া) সমস্যায় কার্যকর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতিদিন 50 মিলি অ্যালোভেরার রস খাওয়া থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করতে কাজ করতে পারে ( তথ্যসূত্র )। এই ভিত্তিতে, এটা বললে ভুল হবে না যে, অ্যালোভেরার রস হাইপো থাইরয়েডের লক্ষণগুলি কমিয়ে থাইরয়েডের চিকিৎসার জন্য একটি ভাল অপশন হিসাবে প্রমাণিত হতে পারে।

থাইরয়েড রোগ নির্ণয় – থাইরয়েড টেস্ট

আমরা ইতিমধ্যেই আর্টিকেলে থাইরয়েড কত প্রকার সে সম্পর্কে বলেছি এবং এর চিকিৎসা কি ধরণের হবে তা থাইরয়েড এর প্রকারের ভিত্তিতে করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে, রোগী কোন ধরনের থাইরয়েডে ভুগছেন তা জানার জন্য, ডাক্তার সাধারানত রক্ত ​​​​পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন:

  • টিএসএইচ পরীক্ষা: এই পরীক্ষায় পিটুইটারি গ্রন্থিতে (মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ) উৎপন্ন TSH (থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন) পরীক্ষা করা হয়। যার মাধ্যমে শরীরে T-3 এবং T-4 থাইরয়েড হরমোনের অবস্থা ধরা পড়ে। পরীক্ষায় TSH মাত্রা বেশি হলে, এটি হাইপোথাইরয়েডের অবস্থা নির্দেশ করে । একই সময়ে, নিম্ন TSH স্তর হাইপারথাইরয়েড (অতিরিক্ত থাইরয়েড হরমোন) নির্দেশ করে।
  • T4 পরীক্ষা: রক্তে T4 হরমোনের আধিক্য হাইপারথাইরয়েড (বর্ধিত থাইরয়েড) নির্দেশ করে। একই সময়ে, রক্তে কম T4 হাইপোথাইরয়েড (থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি) নির্দেশ করে।
  • T3 পরীক্ষা: T4 হরমোন স্বাভাবিক থাকলে, ডাক্তার যদি মনে করেন যে রোগীর হাইপারথাইরয়েডিজমের সমস্যা আছে। তাই এই অবস্থায় ডাক্তার T3 হরমোনের মাত্রার উপর ভিত্তি করে থাইরয়েড বড় হওয়ার কারণ বুঝতে পারেন। হাইপারথাইরয়েড রোগীর মধ্যে T3 এর উচ্চ মাত্রার কারণেও হতে পারে।
  • থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা: এই পরীক্ষার মাধ্যমে, ডাক্তার ইমিউন ডিজঅর্ডারগুলি সনাক্ত করার চেষ্টা করেন যেমন: – গ্রেভস ডিজিজ এবং হাশিমোটো ডিজিজ। গ্রেভস রোগ থাইরয়েড হরমোন বৃদ্ধির একটি সাধারণ কারণ। সেই সঙ্গে হাশিমোটো রোগের কারণে থাইরয়েড হরমোন তৈরি না হওয়ার সমস্যা রয়েছে।

সাধারনত এই সমস্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েডের অবস্থা নির্ণয় করা হয়। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে, ডাক্তার অন্য কিছু পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে আল্ট্রাসাউন্ড, থাইরয়েড স্ক্যান এবং তেজস্ক্রিয় আয়োডিন পরীক্ষা। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তার থাইরয়েড সমস্যার কারণ জানতে পারেন।

আরও পড়ুনঃ চুলের যত্ন নেওয়ার ঘরোয়া উপায়

থাইরয়েড চিকিৎসা – থাইরয়েড রোগের ঔষুধ

রোগীর বয়স, থাইরয়েড গ্রন্থি কি পরিমাণ হরমোন তৈরি করছে এবং রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকরা থাইরয়েডের চিকিৎসা করে থাকেন । 

  • হাইপোথাইরয়েড: এটি ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যেতে পারে। ওষুধ খেলে শরীর প্রয়োজনীয় হরমোন বৃদ্ধি পায়। এই ক্ষেত্রে, ডাক্তাররা সিন্থেটিক থাইরয়েড হরমোন T4 গ্রহণের পরামর্শ দেন, যা শরীরে হরমোন উৎপাদন শুরু করতে পারে। এই কারণেই হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ দেখা দিলে কিছু রোগীকে সারাজীবন এই ওষুধ খেতে হতে পারে।
  • হাইপারথাইরয়েড: ডাক্তাররা থাইরয়েড রোগের লক্ষণ ও কারণের উপর ভিত্তি করে হাইপারথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা করে থাকেন। এই ধরনের থাইরয়েডের ক্ষেত্রে ডাক্তার অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ দিতে পারেন, যার কারণে থাইরয়েড গ্রন্থি নতুন হরমোন তৈরি করা বন্ধ করতে পারে। বিটা-ব্লকার ওষুধ গ্রহণ করলে , থাইরয়েড হরমোন শরীরের উপর প্রভাব বন্ধ করতে পারে। এছাড়াও ওষুধটি হৃদস্পন্দনকে স্বাভাবিক করতে পারে। এছাড়াও, এই ওষুধটি অন্যান্য উপসর্গের প্রভাব কমাতে পারে যতক্ষণ না অন্যান্য চিকিৎসার প্রভাব শুরু হয়। একটি বিশেষ বিষয় হল, এই ওষুধ সেবনে প্রয়োজনীয় থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন কম হয় না। রেডিওআইওডিন থাইরয়েড কোষগুলিকে ধ্বংস করতে পারে যা থাইরয়েড হরমোন তৈরি করে, তবে এটি হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণ হতে পারে।  রোগীর গিলতে বা শ্বাস নিতে সমস্যা হলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।অস্ত্রোপচারে, থাইরয়েডের অংশ বা সমস্ত অংশ অপসারণ করা যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চিরতরে হাইপোথাইরয়েডিজম হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
  • থাইরয়েডাইটিস: NCBI (ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন) এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিদিন 20 মিলিগ্রাম প্রেডনিসোলোন (প্রেডনিসোলোন-একটি স্টেরয়েড ড্রাগ) থাইরয়েডাইটিসের প্রভাব কিছুটা কমাতে পারে ( তথ্যসূত্র )।
  • গলগন্ড: থাইরয়েড গ্রন্থি যদি সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে এর কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নাও হতে পারে। এটি কিছু সময়ের মধ্যে নিজেই নিরাময় হতে পারে। একই সময়ে, চিকিৎসা করা হলেও, ডাক্তার এমন ওষুধ দিতে পারেন, যা থাইরয়েড গ্রন্থিটিকে তার স্বাভাবিক আকারে সঙ্কুচিত করতে পারে। শুধুমাত্র কিছু গুরুতর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
  • থাইরয়েড নডিউল: এর চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর গ্রন্থির অবস্থার ওপর। এই চিকিৎসা নিম্নলিখিত উপায়ে করা যেতে পারে।যদি গ্রন্থিটি ক্যান্সারে পরিণত না হয় তবে ডাক্তার শুধুমাত্র রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন। রোগীকে নিয়মিত পরীক্ষা করা যেতে পারে এবং রক্ত ​​পরীক্ষা এবং থাইরয়েড আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করা যেতে পারে। যদি গ্রন্থির কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে কোনো চিকিৎসা করা যাবে না। যদি গ্রন্থির আকার বড় হয়ে যায় বা ক্যান্সারে রূপ নেয়, তাহলে চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের বিকল্প বেছে নিতে পারেন। গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে শ্বাস নিতে বা গিলতে অসুবিধা হতে পারে। যদি গ্রন্থি অত্যধিক হরমোন উৎপাদন করে, তাহলে রেডিও আয়োডিন ব্যবহার করা যেতে পারে। রেডিওআয়োডিন গ্রন্থি সঙ্কুচিত করতে সাহায্য করতে পারে যাতে এটি কম থাইরয়েড হরমোন তৈরি করতে পারে।
  • থাইরয়েড ক্যান্সার: ক্যান্সারের একমাত্র নিরাময় হল অস্ত্রোপচার। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে, হয় সম্পূর্ণ থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণ করা যেতে পারে অথবা শুধুমাত্র থাইরয়েড গ্রন্থির যতটুকু অংশ সহজে সরানো যায়। যদি ক্যান্সার ছোট হয় এবং লিম্ফ নোডগুলিতে ছড়িয়ে না পড়ে, তাহলে অস্ত্রোপচার একটি ভাল অপশন হতে পারে। এ ব্যাপারে একমাত্র চিকিৎসকই ভালো মতামত দিতে পারবেন। এছাড়াও, ডাক্তাররা অস্ত্রোপচারের পরে রেডিওআইডিন থেরাপিও ব্যবহার করতে পারেন। অস্ত্রোপচারের সময় ভিতরে থাকা বা ছড়িয়ে থাকা ক্যান্সার কোষগুলিকে রেডিও আয়োডিন থেরাপির মাধ্যমে ধ্বংস করা যেতে পারে। থাইরয়েড ক্যান্সারের চিকিৎসা করার আগে একবার চিকিৎসক রোগীর সাথে চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলতে পারেন।

কখন থাইরয়েড অপারেশন প্রয়োজন হয়?

হাইপারথাইরয়েড বা থাইরয়েড নোডুলসের ক্ষেত্রে, রোগীর শ্বাস নিতে বা খাবার গিলতে অসুবিধা হলে ডাক্তার থাইরয়েড অপারেশন এর পরামর্শ দিতে পারেন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, রোগী হাইপোথাইরয়েডের অভিযোগ করতে পারে অর্থাৎ সারাজীবনের জন্য থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি হতে পারে।

থাইরয়েড এর মাত্রা কত

থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন (TSH) মাত্রা থাইরয়েড সনাক্ত করতে পরীক্ষা করা হয়। আমরা নীচের ( তথ্যসূত্র ) স্বাভাবিক TSH মাত্রা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করছি ।

  • সাধারণ TSH রেঞ্জ 0.45 – 5.0 mIU/L (লিটার প্রতি মিলি-আন্তর্জাতিক ইউনিট)।
  • TSH-এর এই মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে, এর মানে হল হরমোনের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। একে হাইপোথাইরয়েডিজম বলে।
  • অন্যদিকে, টিএসএইচ যদি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়, তার মানে হরমোন বেশি তৈরি হচ্ছে। একে হাইপারথাইরয়েডিজম বলে।

থাইরয়েড রোগীর খাবার তালিকা

থাইরয়েডের সমস্যা যদি ভালো করতে হয়, তাহলে থাইরয়েডের চিকিৎসার পাশাপাশি কিছু ঘরোয়া প্রতিকার জরুরী। নীচে আমরা থাইরয়েড এ কী খাওয়া উচিত এবং কী এড়ানো উচিত সে সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছি ।

আমাদের কি খাওয়া উচিত:

  • পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার যেমন সবুজ শাকসবজি, ফল বা ফলের রস এবং বাদাম খাওয়া যেতে পারে।
  • মাছ এবং শিমের মাধ্যমে প্রোটিন গ্রহণ করুন।
  • অলিভ অয়েল এবং ভার্জিন কোকোনাট অয়েল রান্নার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • আপনার ডায়েটে ডায়েটারি ফাইবারের পরিমাণ বাড়ান, কারণ এটি হজমে সাহায্য করতে পারে।
  • এমন চর্বি বেছে নিন, যা LDL অর্থাৎ ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে পারে। এর জন্য আপনি বীজ, বাদাম এবং মটরশুটি বেছে নিতে পারেন।

কি খাবেন না:

  • কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলুন বা কম পরিমাণে সেবন করুন। এগুলো হার্টের সমস্যা ও ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
  • মাংস এবং পনির থেকে আসা স্যাচুরেটেড ফ্যাট খাবেন না।
  • কোমল পানীয় বা অন্যান্য অনুরূপ পানীয় গ্রহণ করবেন না।
  • দুধ খাবেন না বা অন্তত কমিয়ে দিন। এর কারণ কিছু লোকের ল্যাকটোজ সমস্যা রয়েছে। থাইরয়েড পর্যায়ে দুধ খাওয়া TSH মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে ( তথ্যসূত্র )।
  • থাইরয়েডে চিপস, ক্যান্ডি, বার্গার এবং পিজ্জার মতো জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

থাইরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

থাইরয়েড রোগের লক্ষণ ছাড়াও থাইরয়েডের চিকিৎসা না করলে আরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। নিম্নলিখিত পয়েন্টগুলির মাধ্যমে, আসুন এখন সেই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি সম্পর্কে জেনে নেই –

  • উচ্চ কোলেস্টেরল.
  • মাইক্সেডিমা কোমা, খুব কম থাইরয়েড হরমোনের কারণে মস্তিষ্কের ব্যাধি, মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী হতে পারে।
  • গর্ভবতী মহিলাদের অকাল প্রসব, উচ্চ রক্তচাপ, ভ্রূণের বিকাশ এবং গর্ভপাতের সমস্যা
  • হৃদরোগ যেমন: – অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং হার্ট ফেইলিওর
  • অস্টিওপোরোসিস (হাড় দুর্বল হওয়া বা জয়েন্টগুলি ফুলে যাওয়া)
  • অতিরিক্ত চাপ
  • মনোনিবেশ করতে অক্ষমতা
  • পেটে ব্যথার সমস্যা

থাইরয়েড প্রতিরোধ এর টিপস – থাইরয়েড কমানোর উপায়

নিম্নলিখিত ব্যবস্থাগুলির মাধ্যমে থাইরয়েড সমস্যা প্রতিরোধ করা যেতে পারে, যা নিম্নরূপ-

  • তামাক বা সিগারেটের মতো পণ্য থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন
  • অ্যালকোহল ব্যবহার করা থেকে দূরে থাকুন
  • আয়োডিন সমৃদ্ধ খাবার খান।
  • গ্লুটেনযুক্ত খাবার ব্যবহার করবেন না (যেমন: গম, বার্লি, ওটস এবং বাজরা)
  • দুগ্ধজাত খাবারের ব্যবহার যতটুকু সম্ভব কমিয়ে দিন।
  • বিষাক্ত বা ক্ষতিকারক রাসায়নিকের এক্সপোজার এড়িয়ে চলুন
  • ভাজা জিনিস ব্যবহার করবেন না।
  • নিয়মিত ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম করুন। এর জন্য ভুজঙ্গাসন, হালাসন, বিপরিতা-কর্ণি, মৎস্যাসন ও ধনুরাসন ইত্যাদি করা যেতে পারে। এই যোগাসনগুলি শুধুমাত্র একজন প্রশিক্ষিত যোগ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করা উচিত।
  • সময়ে সময়ে ওজন পরীক্ষা করতে থাকুন এবং থাইরয়েড পরীক্ষা করুন যদি ওজনে কোনো পরিবর্তন হয়।

শেষ কথা

এখন নিশ্চয়ই ভালো করে বুঝে গেছেন থাইরয়েড কী, এবং থাইরয়েড কীভাবে হয়। থাইরয়েড সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি, আপনি নিবন্ধটি থেকে আরও শিখেছেন যে সঠিক ডায়েট এবং রুটিন উন্নত করা থাইরয়েডের ঝুঁকি দূরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। সেই সাথে কারো থাইরয়েডের লক্ষণ দেখা গেলে দেরি না করে থাইরয়েড পরীক্ষা করাতে হবে, যাতে সঠিক সময়ে থাইরয়েড রোগ ও এর লক্ষণগুলো নিশ্চিত হওয়া যায়। ফলস্বরূপ, থাইরয়েডের সঠিক চিকিৎসা করা সমস্যাটিকে অগ্রগতি থেকে আটকাতে পারে। এই সমস্যায় ভুগছেন এমন লোকেরা চিকিৎসকের পরামর্শ মত ঔষধ গ্রহনের পাশাপাশি থাইরয়েডের ঘরোয়া প্রতিকারগুলি ব্যবহার করতে পারেন। আশা করি এই আর্টিকেলটি থাইরয়েডের লক্ষণ এবং ঘরোয়া প্রতিকারের উপর ভিত্তি করে স্থায়ী সমাধান পেতে অনেকাংশে সহায়ক হবে। 

আর্টিকেলটি নিয়ে যে কোন ধরনের প্রশ্ন বা মন্তব্য থাকলে কমেন্ট সেকশনে জানান।

ধন্যবাদ

Share on:

আমি অঞ্জন, এই সাইটটির প্রতিষ্ঠাতা। এই ব্লগে টিপস & ট্রিকস, অনলাইন ইনকাম, কম্পিউটার সমস্যা সমাধান সহ আরো অনেক কিছুর উপর সঠিক ও নির্ভুল তথ্য দেওয়া হয়।

Leave a Comment