বারকোড কি এবং বারকোড কিভাবে কাজ করে?

তেল, সাবান, শ্যাম্পু, ক্রিম, পাউডার, ম্যাগি, চিপস, বিস্কুট ইত্যাদির প্যাকেটে কালো সমান্তরাল রেখা অবশ্যই দেখেছেন । মূলত এই সমান্তরাল রেখা গুলোই হল সেই পণ্যটির বারকোড, যাতে সেই পণ্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সকল তথ্য সংরক্ষণ করা থাকে । কিন্তু এই লাইনগুলোর মানে আসলে কি জানেন? না জানলেও চিন্তার কিছু নেই । কারণ আজকের আর্টিকেলে আমরা বারকোড কি এবং বারকোড কিভাবে কাজ করে এই বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব ।

বারকোড

বারকোড শব্দটি শুনলেই প্রথম যে ছবিটা মাথায় আসে তা হল, কিছু কালো এবং সাদা সমান্তরাল রেখা এবং সেই রেখাগুলোর নিচে লেখা কিছু এলোমেলো সংখ্যা । কিন্তু এটি আসলে কোন ছবি নয়, বরং এটি মূলত একটি জটিল কাঠামো যার মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে রাখা হয় । আর এই তথ্যগুলো শুধুমাত্র অপটিক্যাল স্ক্যানারের সাহায্যেই রিড করা যায় 

আপনি যখন কোন মল বা শোরুমে যাবেন, তখন সেখানে দেখবেন যে, ক্যাশ কাউন্টারে বসে থাকা ব্যক্তি একটি ডিভাইসের সাহায্যে প্রোডাক্টগুলোর বারকোড স্ক্যান করে দেখেছেন । মূলত সেই ডিভাইসটি হল একটি অপটিক্যাল স্ক্যানার । যা একটি কম্পিউটারের সাথে কানেক্ট করা থাকে এবং যখন এটিকে বার কোডের উপরে ধরা হয় তখন এটি বারকোড স্ক্যান করে এবং বারকোডে থাকা তথ্য কম্পিউটারে পাঠায় । আর এভাবেই অপটিক্যাল স্ক্যানারের মাধ্যমে বারকোড রিড করা হয় । কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, এই বারকোড কি এবং বারকোড কিভাবে কাজ করে? তাহলে দেরি না করে চলুন জেনে নেয়া যাক –

বারকোড কি?

বারকোড মূলত ডেটা উপস্থাপন করার একটি উপায় বা মাধ্যম । আবার অন্য ভাবে বলতে গেলে কোন পণ্য সম্পর্কে তথ্য লেখার উপায় । যেখানে পণ্যের প্রস্তুতকারক, স্টক, মূল্য, পরিমাণ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য থাকে । তবে এই ডেটা হল মেশিন রিডেবল অর্থাৎ, এটি শুধুমাত্র মেশিন দ্বারাই রিড করা যাবে । এজন্য এই বারকোড পড়ার জন্য অপটিক্যাল স্ক্যানার ব্যবহার করা হয় । যাকে বারকোড স্ক্যানার বা বারকোড রিডারও বলা হয়ে থাকে ।

আমরা আপনাকে এটাও বলএ রাখি যে, QR কোডও এক ধরনের বারকোড । যা 2D অর্থাৎ এটি 2 ডাইমেনশনাল বারকোড ।যেখানে লিনিয়ার বারকোড হল ১ মাত্রিক অর্থাৎ 1D । আর এটা রিড করার জন্য দরকার হয় অপটিক্যাল স্ক্যানার । যাইহোক, অপটিক্যাল স্ক্যানার অনেক ধরনের রয়েছে যেমন Pen Scanner, CCD Scanner (LED Scanner), Laser Scanner, Camera Scanner, Omnidirectional Barcode Scanner ইত্যাদি ।

বারকোডে মূলত পণ্যের প্রস্তুতকারক কোম্পানি, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ, ওজন, পরিমাণ, মূল্য এবং স্টক সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য থাকে । বারকোড রিডারের মাধ্যমে বারকোড স্ক্যান করলে, সেই সব তথ্য কম্পিউটারে যায় । আর পণ্যের বিল তৈরি করতে সাধারণত এই তথ্য ব্যবহার করা হয় । এছাড়াও, বারকোডগুলি পণ্য ট্র্যাক করতে এবং স্টক অ্যাকাউন্টগুলি রাখার জন্যও প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয় ।

বারকোড কিভাবে কাজ করে?

বারকোড কীভাবে কাজ করে সেটি জানতে হলে আপনাকে বারকোডের বিভিন্ন প্রকার এবং অ্যালগরিদম সম্পর্কে বুঝতে হবে এবং সেগুলো সম্পর্কে জানতে হবে । কারণ বারকোডের বিভিন্ন ধরনের স্ট্যান্ডার্ড এবং নাম্বারিং সিস্টেম রয়েছে । এখানে আমরা আপনাদেরকে EAN-13 বারকোডের উদাহরণ দিচ্ছি । কারণ এটি একটি আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন বারকোড, যা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় । এবং এটি GTIN (গ্লোবাল ট্রেড আইটেম নম্বর) স্ট্যান্ডার্ডের একটি অংশ । অর্থাৎ এটি সমগ্র পৃথিবীতে ব্যবহৃত হয়, যার ফলে এর সাহায্যে আপনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন।

বারকোড লাইন এবং সংখ্যা

EAN-13 বারকোড সর্ব মোট ১৩ টি সংখ্যা নিয়ে গঠিত । আর এগুলো হয় ০-৯ সংখ্যা । যদি আমরা লাইনের কথা বলি, তাহলে এতে মোট ৯৩ টি লাইন থাকে । যার মধ্যে ৩+৩+৩ লাইন বারকোডের শুরুতে, মাঝখানে এবং একদম শেষে অবস্থিত । এবং এই লাইনগুলো বাকি লাইনগুলোর চেয়ে একটু বেশী লম্বা । এর মাঝের ৩ লাইন বারকোডকে ২ ভাগে ভাগ করে। এই দুটি অংশে ৪২ টি ব্ল্যাক এবং ৪২ টি হোয়াইট লাইন রয়েছে যা ৭-৭ লাইনের ৬ টি ব্লকে বিভক্ত । এই 6টি ব্লক, ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট লাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন সংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে । নিচের ছবিতে দেখানো হয়েছে –

উভয় অংশে সমান লাইন থাকলেও এগুলোর প্রস্থ ও ব্যবধান ভিন্ন । অর্থাৎ, একই সংখ্যার জন্য, উভয় অংশে বিভিন্ন প্রস্থ এবং স্থান সহ লাইন বা রেখা রয়েছে । উদাহরণস্বরূপ, বাম দিকের ব্লকগুলিতে জোড় সংখ্যায় সাদা লাইন রয়েছে এবং ডান দিকের ব্লকগুলিতে বিজোড় সংখ্যায় সাদা লাইন রয়েছে । যা এর স্থান প্রতিনিধিত্ব করে । এই স্থান থেকে বারকোড স্ক্যানার বুঝতে পারে যে, কোন দিক থেকে স্ক্যান করতে হবে?

বারকোড স্ক্যানিং সাইড

সাদা রেখার প্রথমটিতে যদি জোড় সংখ্যা থাকে তাহলে বারকোড স্ক্যানার বাম সাইড থেকে ডানে স্ক্যান করে । আবার যেখানে বিজোড় সংখ্যক সাদা রেখা থাকে, সেখানে স্ক্যানার ডান থেকে বামে স্ক্যান করে । এভাবে বারকোড উল্টে গেলেও বারকোড স্ক্যানার খুব সহজেই বারকোড স্ক্যান করতে পারে । এর জন্য এটি একটি বিশেষ ধরনের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে । 

আরও পড়ুনঃ ইউটিউব ভিডিওর ওয়াচ টাইম বাড়ানোর টিপস

বারকোডের ধরন

অনেক ধরনের বারকোড রয়েছে । কিন্তু তারপরেও বারকোডকে মূলত 2 ভাগে ভাগ করা হয় । এর একটি লিনিয়ার বারকোড এবং অন্যটি হল 2D বারকোড (টু ডাইমেনশনাল বারকোড) । এই দুটির মধ্যে পার্থক্য কী? আসুন জেনে নেই:-

লিনিয়ার বারকোড

এই বারকোডগুলো মূলত এক মাত্রিক (1D) । অর্থাৎ এগুলোর একটি মাত্র মাত্রা (দৈর্ঘ্য) রয়েছে । সেজন্য তাদের এক মাত্রিক/ 1D বারকোড বলা হয় । এই বারকোডে তথ্যকে সংখ্যাসূচক আকারে সংরক্ষণ করা হয় । অর্থাৎ, এটিকে সংখ্যা আকারে (0-৯) সংরক্ষণ করা হয় । যার ফলে এগুলোর স্টোরেজ ক্ষমতা অনেক কম হয় । আর তাই এই ধরনের বারকোড, ২ডি বারকোডের তুলনায় অনেক কম ডেটা সঞ্চয় করতে সক্ষম ।

তা সত্ত্বেও, আপনি আপনার দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্রায় প্রতিটি জিনিসের প্যাকেটে সহজেই 1D বা একমাত্রিক বারকোড দেখতে পাবেন । যেমন তেল, সাবান, ক্রিম, পাউডার, শ্যাম্পু, ম্যাগি, চিপস, বিস্কুট, চকলেট ইত্যাদি । এগুলো ছাড়াও 1D বারকোড বৃহৎ শিল্প যেমন পরিবহন, খুচরা, স্বাস্থ্যসেবা (হাসপাতাল), অটোমোবাইল, খাদ্য ইত্যাদিতেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

2D বারকোড

এই ধরনের বারকোডগুলি দ্বি-মাত্রিক (2D) অর্থাৎ এগুলোর দুটি মাত্রা (দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ) রয়েছে । এজন্য এদেরকে দ্বিমাত্রিক বা ২ ডাইমেনসনাল বারকোডও বলা হয়ে থাকে । যদিও এগুলোর ডাকনাম হল QR কোড । কিন্তু আসলে এগুলো হল 2D বারকোড । এই ধরনের বারকোডে তথ্য সংখ্যাসূচক, আলফা-সংখ্যাসূচক, বাইট/বাইনারি এবং কাঞ্জি আকারে সংরক্ষণ করা হয় । অর্থাৎ, 0-৯, A-Z, a-z, স্পেশাল ক্যারেক্টার, ISO 8859-1 এবং Shif JIS X 0208 হিসাবে ডেটা সংরক্ষণ করতে পারে । এই ক্ষেত্রে, এগুলোর চারটি ভিন্ন ধরনের মান রয়েছে: –

  • শুধুমাত্র সংখ্যাসূচক – 7089 অক্ষর
  • আলফানিউমেরিক – 4296 অক্ষর
  • বাইট/বাইনারি – 2953 অক্ষর
  • কাঞ্জি / কানা – 1817 অক্ষর

এখানে আপনাদের জানিয়ে রাখি যে, QR কোড হল বারকোডের একটি উন্নত রূপ । যেটি 1994 সালে জাপানি কোম্পানি ডেনসো ওয়েভ তৈরি করেছিল । স্টোরেজের দিক থেকে এটি 1D বা একমাত্রিক বারকোড থেকে অনেক এগিয়ে । অর্থাৎ ১ডি এর তুলনায় এর স্টোরেজ ক্ষমতা অনেক বেশি । এগুলি ছাড়াও, এই ধরনের বারকোড সমস্ত ধরণের ডেটা (টেক্সট, নম্বর, ওয়েবপেজ, লিঙ্ক ইত্যাদি) সংরক্ষণ করতে সক্ষম ।

অন্যদিকে, আমরা যদি ব্যবহারের কথা বলি, তাহলে বর্তমানে QR কোড সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হচ্ছে । এমনকি বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ছোট দোকান ও হ্যান্ডকার্টেও দেখা যাচ্ছে এই কিউআর কোড । আবার ব্যবসার মালিকদের পাশাপাশি, ব্যক্তিগত ভাবেও এটি অনেক বেশি ব্যবহার হচ্ছে । বিশেষ করে অনলাইন পেমেন্টের জন্য (বিকাশ, রকেট) ইত্যাদিতেও QR কোড ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে । আর এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এটি স্ক্যান করার জন্য আলাদা কোনো স্ক্যানারের প্রয়োজন হয় না । আপনি আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই এই কোড স্ক্যান করতে পারবেন ।

কিভাবে বারকোড পড়তে হয়

এখন আপনাদের মধ্যে অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে যে, বারকোডে উপস্থিত লাইন এবং সংখ্যার অর্থ কী? এবং এগুলোর মধ্যে কি ধরনের তথ্য লুকিয়ে আছে? এছাড়াও, যদি একটি বারকোড আমাদের সামনে আসে, তাহলে এটি কীভাবে পড়তে হবে? তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক কীভাবে বারকোড রিড করতে হয় ।

উপড়ে আপনি যে ছবি টি দেখতে পাচ্ছেন তা মূলত একটি EAN 13 বারকোডের ছবি । যা সারা পৃথিবীতে বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হয় । এর সংখ্যা চারটি ভিন্ন ভিন্ন ভাগে বিভক্ত । যার মধ্যে প্রথম বিভাগে থাকা সংখ্যা গুলো হল পণ্যটি কোন দেশ বা অঞ্চলে তৈরি করা হয়েছে সে সম্পর্কে তথ্য দেয়া হয়েছে । অর্থাৎ, এখানে লেখা 89 সংখ্যাটি হল ভারতের কোড । এর মানে এই পণ্যটি ভারতে তৈরি করা হয়েছে । একইভাবে, প্রতিটি দেশ /অঞ্চলের জন্য আলাদা আলাদা কোড বা সংখ্যা রয়েছে । এই সম্পর্কে তথ্যের জন্য, আপনি বারকোড দেশের কোড তালিকাটি দেখতে পারেন ।

এর পরে দ্বিতীয় অংশটি হল প্রস্তুতকারক কোড । যা পণ্যটি কোন কোম্পানি প্রস্তুত করেছে সে সম্পর্কে তথ্য দেয় । একইভাবে, তৃতীয় বিভাগটি হল পণ্য কোড, যার মধ্যে সেই পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য থাকে । এবং চতুর্থ এবং শেষ অংশটি হল একটি চেকসাম অক্ষর । যা বারকোড স্ক্যানারকে বলে যে, বারকোডে যে তথ্য ইনপুট করানো হয়েছে তা সঠিকভাবে নিবন্ধিত নাকি?

আরও পড়ুনঃ ক্রিপ্টোকারেন্সি কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

কিভাবে বারকোড জেনারেট করবেন?

এতক্ষণে আপনারা জেনে গেছেন যে একটি বারকোডে অনেক ধরনের তথ্য থাকে । কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, এই তথ্যগুলো বারকোডে কীভাবে প্রবেশ করানো হয়? বারকোডে ডাটা কিভাবে রাখবেন ? এটি করার জন্য কি কোন মেশিন আছে? যদি কোন মেশিন থাকে, তাহলে কিভাবে সে মেশিনে বারকোড তৈরি হয় ? কিভাবে একটি বারকোড তৈরি করতে হয় ? আসুন পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক –

ধাপ 1. বারকোড সিম্বোলজি সনাক্ত করুন

বারকোড তৈরির করার জন্য প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নিন যে, আপনি সঠিক বারকোড সিম্বোলজি নিয়ে কাজ করছেন কি না? কারণ অনেক ধরনের বারকোড আছে এবং প্রতিটি বারকোড একটি ভিন্ন প্রতীক বা সাইন ব্যবহার করে । এমন অবস্থায়, সঠিক প্রতীক নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । যেমন UPC (ইউনিভার্সাল প্রোডাক্ট কোড) এবং EAN বারকোডগুলি মূলত খুচরা শিল্প গুলোতে ইউজ হয়। আবার কোড 128 বারকোডগুলি পরিবহন এবং লজিস্টিক শিল্পের জন্য ব্যবহৃত হয়।

একইভাবে Codabar বারকোড, ব্লাড-ব্যাঙ্ক এবং ডেলিভারি পরিষেবার জন্য ইউজ করা হয় । তাই অভ্যন্তরীণ ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বারকোড ব্যবহার করা হয় । তাই আপনি যে উদ্দেশ্যে বারকোড তৈরি করছেন সেই অনুযায়ী সঠিক বারকোড সিম্বোলজি নির্বাচন করুন এবং এর পরে পরবর্তী ধাপ অনুসরণ করুন।

ধাপ ২. পণ্য কোড তৈরি করুন

এখন আপনার পণ্যের জন্য একটি পণ্য কোড ক্রিয়েট করুন । অর্থাৎ যে পণ্যটির জন্য বারকোড তৈরি করতে হবে এই পণ্যের কোড তৈরি করুন । এখানে আমরা আপনাকে জানিয়ে রাখি যে ২ ধরনের পণ্য কোড আছে। একটি হল UPC (ইউনিভার্সাল প্রোডাক্ট কোড) এবং অপরটি হল SKU (স্টক কিপিং ইউনিট) কোড।

1. UPC কোড

এটি ৮ থেকে ১২ সংখ্যার একটি সর্বজনীন কোড, যা GS1 দ্বারা জারি করা হয় । আপনি যখন GS1 এ একটি পণ্য রেজিস্টার করবেন তখন এটিকে জারি করা হয় । আপনি UPC কোডের জন্য আবেদন করুন । এই UPC কোড একটি সংখ্যাসূচক কোড, যা পুরো বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য । অর্থাৎ, এর মাধ্যমে আপনি অনলাইনে (Amazon, Flipkart) এবং অফলাইনের যেকোনো জায়গায় আপনার পণ্য সেল করতে পারবেন ।

2. SKU কোড

এটি একটি ৮ থেকে ১২ সংখ্যার আলফানিউমেরিক কোড । যা ইন্টারনাল ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট করার জন্য ব্যবহৃত হয় । এই ধরনের কোডে অঙ্কের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয় । অর্থাৎ, এটি পণ্যের খুচরা বিক্রেতার উপর নির্ভর করে যে তিনি কোডটির কয়টা সংখ্যা ব্যবহার করতে চান । এটি আসলে একটি কাস্টম কোড, যা লেটার এবং সংখ্যার একটি পদ্ধতিগত সমন্বয় এবং এটিকে ইনভেন্টরি অনুযায়ী ডিজাইন করা হয় । অর্থাৎ ইনভেন্টরিতে যত বেশি পণ্য ও ভ্যারাইটি থাকবে, কোডও তত বেশী লম্বা হবে।

যেমন ধরুন আপনি বইয়ের জন্য একটি SKU সিস্টেম তৈরি করছেন । তাহলে সবার প্রথমে আপনাকে বইয়ের জন্য বিকে কোড তৈরি করতে হবে । এরপর প্রধান ক্যাটাগরি যেমন ধরুন, ধর্মীয় বইয়ের জন্য D, ঐতিহাসিকের জন্য H এবং সাহিত্যের বইয়ের জন্য L করা যেতে পারে । এর পরে ইসলাম ধরমের বইয়ের জন্য I, হিন্দু ধর্মের বইয়ের জন্য আবার H এবং বৌদ্ধ ধর্মের জন্য B কোড করা যেতে পারে। এর পরে BC এবং AD কোডগুলি ভাষা (বাংলা-BN, ইংরেজি-EN এবং হিন্দি-HI) এবং সময়কালের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা যেতে পারে । একইভাবে কোড দীর্ঘ হতে হতে শেষ পর্যন্ত BK-BDHHI-AD984 এর মতো কিছু হয়ে যাবে ।

ধাপ 3. বারকোড তৈরি করুন

পণ্য কোড তৈরি করার পরে, এবার বারকোড তৈরি করার পালা । এটি করার জন্য ৩ ভিন্ন অপশন আছে । প্রথমটি হল, অনলাইন বারকোড জেনারেটরের মাধ্যমে । দ্বিতীয়টি হল POS (পয়েন্ট-অফ-সেল) সিস্টেম । এবং ৩য় টি হ্যান্ডহেল্ড বারকোড প্রিন্টার ।আপনি এই তিনটি অপশনের যেকোনোটি বেছে নিতে পারেন ।

1. অনলাইন বারকোড জেনারেটর

বর্তমানে ইন্টারনেটে অনেক ওয়েবসাইট আছে যারা বিনামূল্যে বারকোড তৈরি করার সুবিধা দেয় । আপনি এই ওয়েবসাইটগুলিতে গিয়ে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বারকোড তৈরি করতে পারবেন । আর এটি করার জন্য আপনার শুধু পণ্য কোড থাকতে হবে । কিছু জনপ্রিয় অনলাইন বারকোড জেনারেটর ওয়েবসাইট হল Zoho, বারকোড-জেনারেটর, ruggedtabletpc এবং barcodesinc ইত্যাদি ।

2. POS (পয়েন্ট-অফ-সেল) সিস্টেম

এটি হল একটি অল-ইন-ওয়ান বিজনেস সলিউশন । যা আপনাকে বিক্রয়, ইনভেন্টরি, চেকআউট প্রসেসিং, অর্থপ্রদান এবং ব্যবসা পরিচালনার সাথে সাথে UPC এবং SKU কোড তৈরি করতে দেয় ৷ এর সাহায্যে আপনি আপনার ব্যবসা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ করতে পারবেন । আমরা যদি কিছু জনপ্রিয় POS ব্র্যান্ডের কথা বলি, তাহলে এই তালিকায় Relops, Square, Revel, Lightspeed, Hike POS এবং Shopify POS-এর নাম উল্লেখযোগ্য ।

3. হ্যান্ডহেল্ড বারকোড প্রিন্টার

এই প্রিন্টারকে পোর্টেবল বারকোড লেবেল মেকার এবং পোর্টেবল বারকোড প্রিন্টারও বলা হয় । এটি একটি ছোট ডিভাইস, যা যেকোনো জায়গায় ইউজ করা যায় । অর্থাৎ এই ডিভাইসটি অন দ্য স্পট বারকোড প্রিন্ট করার সুবিধা প্রদান করে । এর জন্য, আপনাকে শুধুমাত্র পণ্য কোড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য (যেমন পণ্যের নাম এবং মূল্য ইত্যাদি) লিখতে হবে । এর পরে এটি সেই তথ্যগুলোকে বারকোডে রূপান্তরিত করে। এবং আপনি এটিকে কাস্টমাইজ এবং মুদ্রণ করতে পারবেন ।

ধাপ-4. বারকোড লেবেল প্রিন্ট করুন

বারকোড তৈরি করার পরে, এটি মুদ্রণ করার সময়। অর্থাৎ লেবেলে জেনারেট করা বারকোড প্রিন্ট করা । তাই এই জন্য অনেক ধরনের অপশন আছে । উদাহরণস্বরূপ, নিয়মিত প্রিন্টার (ইঙ্কজেট এবং লেজারজেট প্রিন্টার), থার্মাল লেবেল প্রিন্টার , অনলাইন লেবেল প্রিন্টার ইত্যাদি ব্যবহফার করতে পারেন । আপনি যদি একটি হ্যান্ডহেল্ড বা পোর্টেবল বারকোড প্রিন্টার ইউজ করেন তাহলে নিচের পদক্ষেপ আপনার জন্য নয় । 

কিন্তু আপনি যদি একটি অনলাইন ওয়েবসাইট বা POS সিস্টেম ব্যবহার করেন তাহলে আপনি ৩ টি জিনিস করতে পারেন ।প্রথমত, আপনি একটি ইঙ্কজেট বা লেজারজেট প্রিন্টার ব্যবহার করতে পারেন। ২য় থার্মাল বারকোড প্রিন্টার ব্যবহার করতে পারেন। এবং ৩য়, আপনি এটি একটি অনলাইন বারকোড প্রিন্টার দিয়ে প্রিন্ট করতে পারেন । 

বারকোডের ইতিহাস

অনেকের মনে প্রশ্ন আসে যে, বারকোড কে আবিস্কার করেন? অথবা বারকোডের আবিস্কারক কে ? নরম্যান জোসেফ উডল্যান্ড এবং বার্নার্ড সিলভার সর্বপ্রথম বারকোড আবিষ্কার করেন । বার্নার্ড সিলভার, ১৯৪৮ সালে এই ধারণা নিয়ে প্রথম কাজ করা শুরু করেন এবং অনেক সিস্টেম তৈরি করেছিলেন । কিন্তু তিনি বারকোড তৈরিতে পুরোপুরি সফল হননি । শেষ পর্যন্ত নরম্যান জোসেফ উডল্যান্ড মোর্স কোডের উপর ভিত্তি করে এর ডটস এবং ড্যাশগুলিকে নীচে টেনে এনে, সেগুলোর থেকে সরু এবং প্রশস্ত রেখা তৈরি করে বারকোড আবিষ্কার করেন ।

নরম্যান জোসেফ উডল্যান্ড এবং বার্নার্ড সিলভার ১৯৪৯ সালে বারকোডের জন্য একটি পেটেন্ট দাখিল করেন । এবং পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে তিনি পেটেন্ট পেয়েছিলেন। তারপর জুন ১৯৭৪ সালে প্রথম UPC বারকোড স্ক্যানার ট্রয় (ওহিও) এর ‘মার্শ সুপার‘ মার্কেটে ইনস্টল করা হয়েছিল এবং এই বারকোডটি প্রথমবারের মতো রিগলি’স কোম্পানির পণ্যের (চুইং গাম) প্যাকেটে ইউজ করা হয়েছিল ।

বারকোড সম্পর্কে কিছু কমন প্রশ্ন

প্রশ্ন 1. বারকোড কি?

উত্তর:  বারকোড হল একটি ভিজ্যুয়াল এবং মেশিন রিডেবল আকারে কোন পণ্য সম্পর্কে ডেটা লেখার একটি উপায় । যেখানে পণ্যের প্রস্তুতকারক, স্টক, মূল্য, পরিমাণ ইত্যাদি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য দেওয়া থাকে ।

প্রশ্ন 2। বারকোড কে আবিস্কার করেন?

উত্তরঃ  বারকোড আবিষ্কার করেন  নরম্যান জোসেফ উডল্যান্ড এবং বার্নার্ড সিলভার । 

প্রশ্ন 3। বারকোড কত প্রকার?

উত্তরঃ  বারকোড প্রধানত ২ প্রকার। একটি লিনিয়ার বারকোড (1D বারকোড) এবং অন্যটি হল 2D বারকোড (QR কোড) ।

প্রশ্ন-৪। বারকোড কোন কোডের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে?

উত্তরঃ  বারকোড মোর্স কোডের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে ।

প্রশ্ন-5। বারকোডে কি ধরনের তথ্য থাকে?

উত্তর:  বারকোডে মূলত পণ্যের প্রস্তুতকারক কোম্পানি, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ, ওজন, পরিমাণ, মূল্য এবং স্টক সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের তথ্য থাকে ।

প্রশ্ন-6। কিভাবে বারকোড পড়তে হয়?

উত্তর:  আপনি ৩ টি উপায়ে বারকোড পড়তে পারবেন । প্রথমত একটি বারকোড স্ক্যানার বা বারকোড রিডার ব্যবহার করে বারকোড রিড করতে পারবেন । দ্বিতীয়ত, GS1 ওয়েবসাইটে গিয়ে । এবং ৩য়, আপনার স্মার্টফোনের ক্যামেরা বা বারকোড স্ক্যানার অ্যাপ ব্যবহার করেও বারকোড পড়তে পারবেন । বিশেষ করে 2D বারকোডের জন্য ।

প্রশ্ন-7। কিভাবে বারকোড তৈরি করবেন?

উত্তরঃ  বারকোড তৈরি করা অনেক সহজ। এর জন্য আপনি এই ৩ টি কাজ করতে পারেন। প্রথমত, আপনি বারকোড জেনারেটর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে বারকোড তৈরি করতে পারেন । দ্বিতীয়ত, পয়েন্ট-অফ-সেল (POS) সিস্টেম ইউজ করে এবং তৃতীয়, আপনি পোর্টেবল বারকোড প্রিন্টার ইউজ করতে পারেন ।

প্রশ্ন-৮। বারকোড রিডার কত প্রকার?

উত্তরঃ অনেক ধরনের বারকোড রিডার আছে। যেমন  পেন স্ক্যানার , লেজার স্ক্যানার, সিসিডি স্ক্যানার (এলইডি স্ক্যানার নামেও পরিচিত), স্মার্ট ফোন ক্যামেরা স্ক্যানার, সর্বমুখী বারকোড স্ক্যানার ইত্যাদি ।

প্রশ্ন-9। কিভাবে পণ্যের উপর বারকোড প্রিন্ট করবেন?

উত্তর:  বারকোড প্রিন্ট করার জন্য আপনার কাছে ৩ টি অপশন রয়েছে। প্রথমত, আপনি একটি ইঙ্কজেট বা লেজারজেট প্রিন্টার ইউজ করে প্রিন্ট করতে পারেন । দ্বিতীয়ত, থার্মাল বারকোড প্রিন্টারের মাধ্যমে এবং তৃতীয়, আপনি অনলাইন বারকোড প্রিন্টার পরিষেবাগুলির সাহায্যে বারকোড প্রিন্ট করতে পারবেন ৷

শেষ কথা

আমরা আশা করছি আজকের আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনারা বারকোড সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক তথ্য জানতে পেড়েছেন । আর্টিকেলটি নিয়ে যে কোন ধরনের প্রশ্ন বা মন্তব্য থাকলে কমেন্ট সেকশনে জানান ।

ধন্যবাদ ।

Share on:

আমি অঞ্জন, এই সাইটটির প্রতিষ্ঠাতা। এই ব্লগে টিপস & ট্রিকস, অনলাইন ইনকাম, কম্পিউটার সমস্যা সমাধান সহ আরো অনেক কিছুর উপর সঠিক ও নির্ভুল তথ্য দেওয়া হয়।

Leave a Comment