ব্লকচেইন কি ? ব্লকচেইন প্রযুক্তি কি? ব্লকচেইনের কার্যপ্রণালী

আপনি কি জানেন ব্লকচেইন কি অথবা ব্লকচেইন প্রযুক্তি কি? বিটকয়েনের নাম নিশ্চয়ই আপনারা অনেকেই শুনেছেন। বিটকয়েন একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি অর্থাৎ ডিজিটাল টাকা (যে টাকার Physical কোন অস্তিত্ব নেই)। এই বিটকয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সি আসলে ব্লকচেইন প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি। আজকের আর্টিকেলে আমরা ব্লকচেইন টেকনোলজি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

বিটকয়েন ক্রিপ্টোকারেন্সি খুব নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়, কারণ এর পিছনে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে অনেক ডাটা ব্লক থাকে এবং এই ব্লকগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে একটি ব্লকচেইন গঠন করে।

ব্লকচেইন টেকনোলজি সম্পর্কে জানার আগে ব্লকচেইন কি সেটা বোঝা জরুরী, তাহলে প্রথমে জেনে নেওয়া যাক ব্লকচেইন কি?

ব্লকচেইন কি

হাজার হাজার এবং লক্ষ লক্ষ কম্পিউটারের সংযোগের মাধ্যমে যেমন ইন্টারনেট উদ্ভাবিত হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে ডাটা ব্লকের একটি দীর্ঘ শৃঙ্খলকে (ডেটা) ব্লকচেইন নাম দেওয়া হয়েছে।

ব্লকচেইন শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথম শব্দটি ব্লক এবং দ্বিতীয় শব্দটি হল চেইন। ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে অনেক ডাটা ব্লক থাকে, এই সমস্ত ডেটা ব্লকে ক্রিপ্টোগ্রাফি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডেটা এনকোড করা হয়। এবং এই ব্লকগুলি একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে একটি দীর্ঘ চেইন তৈরি করে।

প্রতিটি ব্লকে রয়েছে তার ঠিক আগের ব্লকের একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ, একটি টাইমস্ট্যাম্প এবং লেনদেনের তথ্য। এবং এইভাবে প্রতিটি ব্লকের সাথে সম্পর্কিত ডেটা তার পাশের ব্লকে সংরক্ষিত থাকে। সুতরাং একবার ব্লকে ডেটা রেকর্ড হয়ে গেলে এই ডেটা আর মুছে ফেলা যাবে না।

ব্লকচেইন
ব্লকচেইন

ব্লকচেইন প্রযুক্তি কি

ব্লকচেইন টেকনোলজি অনেক পুরনো একটি প্রযুক্তি। এই কৌশলটি প্রথম 1991 সালে স্টুয়ার্ট হ্যাবার এবং ডব্লিউ স্কট স্টর্নেটা ব্যাখ্যা করেছিলেন। ব্লকচেইন প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য ছিল টাইমস্ট্যাম্প ডিজিটাল ডকুমেন্টস। যাতে কেউ এটিকে টেম্পার বা পরিবর্তন করতে না পারে।

২০০৮ সালে একজন রহস্যময় জাপানি ব্যক্তি, সাতোশি নাকামোতো ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটকয়েন আবিষ্কার করেছিলেন। এবং তারপর থেকে ব্লকচেইন প্রযুক্তি অনেক বেশী আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

 

ব্লকচেইন প্রযুক্তির ইতিহাস

ব্লকচেইনকে ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য একটি বিপ্লবী প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কিন্তু এই প্রযুক্তির উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, এই ব্লকচেইন প্রযুক্তি 2008 সালে বিটকয়েন আবিষ্কারের পর এই ক্রিপ্টো-মুদ্রাকে সমর্থন করার জন্য আবিষ্কৃত হয়েছিল। এটি এমন একটি আধুনিক প্রযুক্তি যা ছাড়া বিটকয়েন বা অন্য কোন ধরনের ক্রিপ্টো-কারেন্সি লেনদেন করা অসম্ভব।

আরও পড়ুনঃ কিভাবে কম্পিউটারে পপ আপ বিজ্ঞাপন বন্ধ করবেন

ব্লকচেইন কিভাবে কাজ করে

ব্লকচেইনে অনেক ব্লক থাকে এবং এই ব্লকগুলিতে আগের ব্লকের হ্যাশ (Prev_Hash), টাইমস্ট্যাম্প এবং লেনদেনের ডেটা সংরক্ষণ করা হয়। এর পরে, ব্লক এবং নোডগুলিকে সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়।

এখন একটি ব্লকচেইনের সমস্ত নোড একে অপরের সাথে সংযুক্ত। এবং তারা ক্রমাগত একে অপরের সাথে নতুন ডেটা ব্লক আদান প্রদান করে। যার ফলে সমস্ত নোড সর্বশেষ তথ্যগুলির দ্বারা সবসময় আপ টু ডেট থাকে।

ব্লকচেইন মূলত একটি P2P বা পেয়ার টু পেয়ার নেটওয়ার্ক গঠন করে, যার ফলে ব্লকচেইনের প্রতিটি ব্লকের ডেটা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকা যে কোনো ব্যাক্তি ভেরিফাই করতে পারে।

যখন কোন নতুন ব্যক্তি এই ব্লকচেইন নেটওয়ার্কে জয়েন করে, তখন সে তার সামনের এবং পূর্বের সব ব্লকগুলোর একটি কপি পেয়ে যায় এবং সে এই কপি থেকে প্রতিটি ব্লককে ভেরিফাই করে এবং কনফার্ম করে যে ব্লকচেইনে থাকা সব ডেটা এখনও সঠিক রয়েছে।

ব্লকচেইনের ব্লকগুলোকে যত বেশি বার Verify করা হয়, Data গুলো ততই বেশী অপরিবর্তনীয় হয়ে ওঠে। মুলত এভাবেই Blockchain প্রযুক্তি এগিয়ে যেতে থাকে। আমরা প্রায় সবাই জানি যে, বিটকয়েনের ট্র্যানজেকশন গুলো ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। তাহলে চলুন উদাহরণের মাধ্যমে দেখা যাক, এই Blockchain প্রযুক্তি কিভাবে কাজ করে?

ধরুন, আপনার কাছে ১০ Bitcoin রয়েছে এবং আপনি সেখান থেকে ৬ বিটকয়েন আমার কাছে পাঠাতে চাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে এই বিটকয়েন অ্যামাউন্টটি আপনার বিটকয়েন ওয়ালেট থেকে আমার ওয়ালেটে তখনই ট্রান্সফার হবে, যখন আপনি আমার BTC ওয়ালেট অ্যাড্রেসে বিটকয়েনটি সেন্ড করবেন। এবং বিটকয়েন সেন্ড করার সাথে সাথে এই লেনদেনটির সমস্ত ডিটেইলস নিয়ে ব্লকচেইনে একটি নতুন ব্লক ক্রিয়েট হবে। এই ব্লকটির ভেতরে ডেটা হিসেবে থাকবে সেন্ডার, মানে আপনার বিটকয়েন ওয়ালেট অ্যাড্রেস, রিসিভার অর্থাৎ আমার বিটকয়েনের ওয়ালেট অ্যাড্রেস এবং আপনি যে পরিমাণ বিটকয়েন সেন্ড করেছেন তার অ্যামাউন্ট।

এবার ক্রিয়েট হওয়া এই নতুন ব্লকটি ব্লকচেইনে সংযুক্ত থাকা সবার সামনে আসবে ভেরিফাই করার জন্য। সবাই যখন ব্লকটিকে ভেরিফাই করে কনফার্ম করবেন যে সবকিছু সঠিক আছে, তখন এই লেন-দেনের রেকর্ডটি ব্লকচেইনে স্থায়ীভাবে সংরক্ষন করে রাখা হবে এবং ট্র্যানজেকশনটি সম্পন্ন হবে।

Bitcoin এর ক্ষেত্রে এই ব্লক ভেরিফিকেশনের কাজটি যারা করে থাকে তাদেরকে বিটকয়েন মাইনার (BitCoin Miner) বলা হয়। আর, এই ট্র্যানজেকশনটি কমপ্লিট করার জন্য আপনাকে যে পরিমাণ অর্থ ফি হিসেবে দিতে হবে, তার বেশীরভাগ পাবে BitCoin মাইনাররা। যারা তাদের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার ইউজ করে বিটকয়েন মাইনিং এর কাজ করছেন বা এই ব্লক ভেরিফিকেশন করেছেন। এবার নিশ্চই কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছেন যে ব্লকচেইন মূলত কিভাবে কাজ করে এবং বিটকয়েন মাইনিং করার কারণে কেনই বা মাইনাররা BitCoin উপার্জন করতে পারে।

ব্লকচেইন প্রযুক্তির সুবিধা

ব্লকচেইন প্রযুক্তির সুবিধা গুলো নিচে দেওয়া হল –

নিরাপত্তা

ব্লকচেইন টেকনলজি খুব নিরাপদ কৌশল কারণ প্রতিটি লেনদেন ক্রিপ্টোগ্রাফি কৌশল দ্বারা এনক্রিপ্ট করা হয়। এবং হ্যাশিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি ব্লকের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা হয়।

এছাড়াও ব্লকচেইন সিস্টেমে ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন থাকায় এবং প্রতিনিয়ত ইনফরমেশন গুলো আপডেট হওয়ার কারণে এখানে তথ্য চুরি হওয়া অথবা দূর্নীতি হওয়া একেবারেই অসম্ভব।

স্বচ্ছতা

যখন ব্লকে ডেটা রেকর্ড করা হয়, তার পূর্বে একবার ব্লকচেইনের লেনদেন যাচাই করা হয়। এই সিস্টেমে ডেটা মুছে ফেলা যায় না, যার ফলে ডেটার স্বচ্ছতা বজায় থাকে। এবং এরই সাথে, নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত থাকা সমস্ত নোডগুলি সবসময় আপডেট রাখা হয়।

তৃতীয় পক্ষের ঝামেলা থেকে মুক্তি

ব্লকচেইন প্রযুক্তির জন্য কোন তৃতীয় পক্ষের প্রয়োজন হয় না। ফলে বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে যে কেউ খুব সহজেই লেনদেন করতে পারে কোন রকম ঝামেলা ছাড়া। যা বর্তমানে প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেমে অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ এফটিপি সার্ভার কি? বেস্ট FTP Server BD List

ভবিষ্যতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার

বর্তমান সময়ে ব্লকচেইন প্রযুক্তি শুধুমাত্র ব্যবহার করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে যেমন বিটকয়েন। কিন্তু ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নিম্নলিখিত সেক্টর গুলোতে ব্যবহার করা যেতে পারে

  • ব্যাংকিং এবং বীমা সেক্টর
  • সাইবার নিরাপত্তা
  • স্বাস্থ্য
  • তথ্য প্রযুক্তি এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা
  • শিক্ষা
  • ডেটা স্টোরেজ এবং ডেটা ট্রান্সফার
  • সরকারী পরিকল্পনা
  • গোয়েন্দা ব্যুরো

বিটকয়েন এবং ব্লকচেইনের মধ্যে পার্থক্য কি?

ব্লকচেইন টেকনোলজি এবং বিটকয়েন দুটোই সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। প্রকৃতপক্ষে, ব্লকচেইন একটি প্রযুক্তি, একটি প্ল্যাটফর্ম যেখানে শুধুমাত্র ডিজিটাল মুদ্রা নয়, যেকোনো জিনিস ডিজিটালাইজ করা যায় এবং তার রেকর্ড রাখা যায়। অর্থাৎ ব্লকচেইন একটি ডিজিটাল খাতা। অন্যদিকে, বিটকয়েন একটি ডিজিটাল মাধ্যম, যার মাধ্যমে কোন জিনিস বিক্রি ও কেনা যায়। যদিও এটিকে মুদ্রা বলা ভুল, কারণ বাস্তব জগতে এর কোন অস্তিত্ব নেই। ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কগুলিও ব্লকচেইন প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়।

শেষ কথা

পরিশেষে আমরা এটা আশা করতে পারি যে ব্লকচেইন প্রযুক্তি মধ্যস্থতাকারীদের সরিয়ে সব ধরনের লেনদেনের দক্ষতা উন্নত করবে এবং এটি সমস্ত লেনদেনের খরচও কমাবে। একই সময়ে, এটি স্বচ্ছতাও বাড়াবে এবং প্রতারণামূলক লেনদেন থেকে সাধারণ জনগণ মুক্তি পাবে, কারণ এর অধীনে প্রতিটি লেনদেন রেকর্ড করা হবে এবং জনসাধারণের খাতায় বরাদ্দ করা হবে।

আজ, বিশ্বব্যাপী সাইবার সুরক্ষা, ব্যাংকিং এবং বীমার ক্ষেত্রে উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে, তাদের সুরক্ষিত করার জন্য ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্লকচেইন একটি গেম চেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে, যদি এর গুরুত্ব এবং সম্ভাবনা সময়মতো স্বীকৃত হয়।

আজকের আর্টিকেলে আমরা ব্লকচেইন কি? ব্লকচেইন প্রযুক্তি কি? ব্লকচেইন কিভাবে কাজ করে? ব্লকচেইন প্রযুক্তির ভবিষ্যতের ব্যবহারের পাশাপাশি এই প্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি।

আমরা আশা করছি আপনি এই আর্টিকেল থেকে ব্লকচেইন সম্পর্কে মোটামুটি ধারনা পেয়েছেন। আর্টিকেলটি সম্পর্কে যে কোন ধরনের প্রশ্ন বা মন্তব্য থাকলে কমেন্ট সেকশনে জানান। ধন্যবাদ

Share on:

আমি অঞ্জন, এই সাইটটির প্রতিষ্ঠাতা। এই ব্লগে টিপস & ট্রিকস, অনলাইন ইনকাম, কম্পিউটার সমস্যা সমাধান সহ আরো অনেক কিছুর উপর সঠিক ও নির্ভুল তথ্য দেওয়া হয়।

Leave a Comment